ডেনমার্ক, বসন্ত আর রবীন্দ্রনাথ

২০২০ তে আমার বসন্তকাল কেটেছে ডেনমার্কের অ্যালবর্গ শহরে। পড়াশোনার সূত্রে কলকাতা ছেড়ে ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা ছেড়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম সেখানে। দিব্যি চলছিল ক্লাস, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, অপেরা হাউসে গানের অনুষ্ঠান শুনতে যাওয়া ইত্যাদি। এমন সময় লকডাউন শুরু হলো। সবকিছু বন্ধ। যাওয়ার জায়গা বলতে শুধু কয়েকজন বন্ধুর বাড়ি, আর পার্ক। ছোটবেলা থেকে কলকাতায় যেমন পার্কে বেড়িয়ে বড় হয়েছি, আলবর্গের পার্কগুলো তার থেকে পুরোপুরি আলাদা। কোনো পাঁচিল নেই, নেই কোনো মালির শাসন। এই পার্কে গাছেরা নিজের মতন বেড়ে ওঠে, প্রকৃতির ভাঙা গড়া চলে নিজের নিয়মে। পার্কগুলো যেমন কলকাতার মত নয়, তেমনই ডেনমার্কের বসন্তও কলকাতার মত নয়। কলকাতার বসন্ত মানে শীত চলে যাবার দুঃখ, গরমকালের পূর্বাভাস। ধুলো – ধোঁয়া – ঘাম আর ট্রাফিকের ফাঁকে হঠাৎ করে পলাশ ফুলের লাল হাতছানি। সন্ধেবেলার ছাদে অল্প একটু দক্ষিণের হাওয়া। ডেনমার্কের বসন্ত কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার বসন্ত, ঝলমলে অথচ মিষ্টি রোদের বসন্ত। এই বসন্ত মানে সাদা, নীল, হলুদ আর গোলাপী ফুলের মেলা। অকস্মাৎ বৃষ্টির পর যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে আকাশের নীল হয়ে যাওয়ার বসন্ত। এই বসন্ত তো আমার অচেনা লাগার কথা। এমন বসন্ত তো আগে কখনো দেখিনি। তবু ঠিক অচেনা লাগেনি এই বসন্ত। বাড়ি থেকে ৮৫৫০ কিলোমিটার দূরে কোনো গাছের পাতার ফাঁকে আলো পড়তে দেখে, কিংবা কোনো অজানা পথের বাঁকের ছবি তুলতে গিয়ে মনে পড়েছে রবীন্দ্রনাথের বাঁধা বসন্তের গানের লাইন। সেই লাইনগুলোই এক করে দিয়েছে আমার দুই পৃথিবী, আমার দুই বসন্ত। সেই লাইনের জন্যেই কিছুক্ষনের জন্যে মুছে গিয়েছে মহামারীর ভয়, পরিবারের চিন্তা, বাড়ি না যেতে পারার আশঙ্কা। তখন আমি নীল ফুলের কার্পেটে দাঁড়িয়ে শুধু দিগন্তের দিকে চেয়ে থেকেছি, পাইনের বনে হাওয়ার শব্দ শুনেছি। এক বসন্ত কখন যেন মিলিয়ে গিয়েছে আরেক বসন্তের সঙ্গে। এই অনলাইন প্রদর্শনীতে রয়েছে আমার তোলা ডেনমার্কের বসন্তকালের কয়েকটি ছবি। তাদের সঙ্গে থাকলো রবীন্দ্রনাথের সেই লেখাগুলো, যেগুলো দুই বসন্তকে এক করে দিয়েছিল। – প্রৈতি